ইবিতে প্রক্টর, নিরাপত্তাকর্মীকে হেনস্তা; সাংবাদিকদের ওপর মব

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০১ পিএম

ইবি প্রতিনিধি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রক্টর, নিরাপত্তা কর্মীকে হেনস্থা ও সাংবাদিকদের ওপর মব সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কতিপয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এর আগে নিয়োগ বোর্ড বাঁনচালের চেষ্টায় ছাত্রদল আহ্বায়ক কর্তৃক বিভাগীয় শিক্ষক অপহরণের অভিযোগ উঠে।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাত ৮ টায় ঝিনাইদহ পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে অপহৃত সেই শিক্ষককে প্রশাসনের হেফাজতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হলে এমন ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় আধা ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকেন প্রক্টরিয়াল টিম ও সাংবাদিকবৃন্দ।
 
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা হলেন—ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের রিফাত ইসলাম, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ইফতিহার উদ্দীন, নাভিদ হাসান, আব্দুল কাইয়ুম, মুহাম্মদ আমির, কাইসার শামস ও শাকির আহমেদ রাজ, ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মোহাম্মদ সাব্বির, রেদোয়ানুল ইসলাম রোহান, তুষার ও আলি হাসান এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রিন্স ও জনি। তাদের অধিকাংশ ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে ছাত্রদলের কর্মী ইফতিহারের নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন অন্যান্য শিক্ষার্থীরা।
 
জানা যায়, গাড়িটি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছালে ট্যুরিজম বিভাগের শিক্ষার্থীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়। এতে উত্তপ্ত অবস্থা তৈরি হয়। অপহৃত শিক্ষকের নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় উপাচার্য ভবনে নেয়ার কথা থাকলেও ট্যুরিজম বিভাগের কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী পূর্বেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেয় এবং তাঁকে (শিক্ষককে) ফ্যাকাল্টি বিল্ডিংয়ে নিতে চায়। তবে, অপহৃত শিক্ষক নিরাপত্তার বিষয়ে আশংকা প্রকাশ করলেও কতিপয় শিক্ষার্থীরা গাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখেন। এদিকে, ঘটনাস্থলে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামানকে ওই শিক্ষার্থীরা ধাক্কা দেয় এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জনি এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করে ইফতিহার উদ্দীন।
 
ঘটনাস্থলে প্রায় আধা ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের  জানানো হয়, "তোমরা প্রশাসন ভবনে সামনে আসো সেখানে শিক্ষকের সাথে কথা বলো।জুয়েল যা বলবে আমরা সেভাবেই করবো। জুয়েল যেখানে যেতে চায়, সেখানেই যাবে। তোমরা (শিক্ষার্থীরা) কথা বলো।
 
এ সময় অপহৃত শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের কাছে আমাকে হস্তান্তর করবে তখন দায়িত্ব প্রশাসনের। তোমরা তো আমাকে চেনোই। আমি যেটা বলছি, এটা করো। এখান থেকে নামা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনে শুনেই বলছি। এখানে নামা ঠিক হবে না।’
 
ওই বিভাগে একাধিক শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমাদের সবার সাথে কথাবার্তা যা বলার ইফতিহার বলেছিল। তার আহ্বানে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। আমরা শুধু বিভাগ ও স্যারের জন্য গেছিলাম; অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। ক্যাম্পাসে (জুয়েল) নিরাপত্তার কারণে স্যারকে প্রশাসন ভবনে নিয়ে যাওয়ার বিষয় জানতে পেরে কিছু শিক্ষার্থী আটকে দেয় এবং হট্টগোল সৃষ্টি করে। যদিও আমরা সরে আসি। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার কথা জানতে পারি।
 
ঘটনার পরবর্তী সময়ে কিছু সংখ্যক বিভাগীয় শিক্ষার্থীরা অপহৃত শিক্ষকের সাথে প্রশাসন ভবনে সাথে দেখা করেন। এসময় বিভাগীয় শিক্ষার্থী সাগর সাংবাদিকদের জানান, স্যারের সাথে দেখা করেছিলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম স্যার কে, আপনার কোনো সমস্যা আছে? স্যার প্রতিউত্তর দিলেন, না আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি ভালো আছি আর এখন একদম নিরাপদে আছি তোমরা কোনো টেনশন কইরো না- আমার ছেলে, আমার শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো টেনশন না করে। আমরা স্যার কে সাবলীল দেখেছি। পরবর্তীতে বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের কাছে স্যারের বার্তা পৌঁছে দেই।
 
এদিকে, সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করলে রিফাত ইসলাম, ইফতিহার উদ্দীন, মোহাম্মদ সাব্বির, প্রিন্স ও জনিসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদেরকে ঘিরে মব সৃষ্টি করে তাদের লাঞ্চিত করার অভিযোগ উঠে। এসময় তাদের মধ্যে মুহাম্মদ আমির, কাইসার শামস, শাকির আহমেদ রাজ ও আব্দুল কাইয়ুম, রেদোয়ানুল ইসলাম রোহান, তুষার ও আলি হাসান উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
 
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী রিফাত ইসলাম বলেন, "স্যার ক্যাম্পাসে আসার পর আমরা দাবি জানিয়েছিলাম যে, চেয়ারম্যান স্যার বিভাগে গিয়ে আমাদের সামনে কথা বলবেন। নিরাপত্তার কারণে বিভাগে যাওয়া যাবে না জানতে পেরে আমরা তখন শঙ্কিত হয়ে পড়ি যে, হয়তো স্যারের মুখ থেকে সত্যটা জানতে পারব না।"
প্রক্টর ও নিরাপত্তা কর্মী হেনস্থার বিষয় তিনি বলেন, "শিক্ষকের গায়ে হাত দেওয়া নিঃসন্দেহে অপরাধ। তবে ওই হট্টগোলের মধ্যে কে কাকে ধাক্কা দিয়েছে, তা আমার চোখে পড়েনি। যদি কেউ প্রক্টর স্যারের সাথে এমন আচরণ করে থাকে, তবে তা অবশ্যই ভুল এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু বহিরাগতরা এসে যখন হামলা করল, তখন একা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল বহিরাগতদের আটকানো এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া।
 
অভিযুক্ত আরেক শিক্ষার্থী কাইয়ুম বলেন, মারামারির সময় ছিলাম না তার আগে মেইন গেট থেকে স্যারকে (সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম) প্রশাসন ভবন নিয়ে আসা পর্যন্ত ছিলাম আর মারামারি হওয়ার পূর্বেই সেখান থেকে চলে যাই। এখন বুঝতে পারছি সেই সময় আমাদের ভুল বুঝাবুঝি হয়েছিল। আমরা মনে করেছিলাম স্যার হয়তো নিরাপদে ছিল না। তারপর স্যার আমাকে বলল এই জায়গাটা আমার জন্য নিরাপদ না আমার যাওয়ার ব্যবস্থা কর।
 
তিনি আরও বলেন, কেউ আমাকে আসতে বলেনি, আমি ব্যক্তিগতভাবেই আসছিলাম স্যারকে দেখার জন্য যে স্যার ভালো আছেন কিনা আর স্যারকে আমি সম্মান করি ও ভালোবাসি। সে সময় অনেক হট্টগোল হয়েছিল আর সাংবাদিকরা রেগে ছিল। সাংবাদিকরা যখন নিউজ কভার করছে তখন কারো সাথে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল।
 
সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি ওনাদের আশেপাশেও ছিলাম না আমি স্যারের গাড়ির সাথে ছিলাম। আমি তখন সবার সামনে মাফ চেয়ে হাতজোড় করে বলেছিলাম যে ভাই আপনারা সবাই সাইট দেন স্যার কে প্রশাসন ভবনের ভিতরে নিয়ে যাব বা জায়গাটা দেন। তারপর স্যারের সাথে কথা বলি যে ভিতরে যাওয়ার জন্য কেউ জায়গা দিচ্ছে না। তখন অনেকেই আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে সারাদিন কোথায় ছিলে ? আমি বুঝতে পারি যে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে তারপর আমার এক বন্ধু আমাকে সেখান থেকে নিয়ে চলে আসে।
 
নিরাপত্তা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জনি বলেন, "আমরা পুলিশ প্রটোকলে জুয়েল স্যারকে ক্যাম্পাসে আনলে তারা স্যারকে প্রশাসন ভবনে যেতে দিবে না, ডিপার্টমেন্টেই নিয়ে যাবে বলে গাড়ি আটকে দেয়। কিন্তু ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যাওয়া তো নিয়ম না। তখন তারা জোর-জবরদস্তি করে এবং গাড়িতে খুব ধাক্কাধাক্কি করে। সাংবাদিকদের যখন ছবি তুলতে যায় সাংবাদিকদেরকে তারা আক্রমণ করে। আক্রমণ করার পর আমরা যখন ঠেকাতে যাই; আমরা যারা নিরাপত্তা কর্মকর্তা আছি এবং প্রক্টর স্যার সহ, প্রক্টর স্যারের সাথে ধাক্কা দেয় পরে ঠেকাতে গেলে আমাকে মারে। আমার কানে এখনো চরম আঘাত অনুভব করি।”
 
তিনি আরো বলেন, “যারা এই মবটা সৃষ্টি করেছে, আমরা তাদের বিচার চাই। প্রক্টর স্যারের গায়ে হাত দেওয়া আমার গায়ে হাত দেওয়ার এই বিচার আমরা চাই প্রশাসনের কাছে। প্রশাসন যেন অবিলম্বে অতি দ্রুত এই বিচার করে।”
 
বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, “পুলিশি পাহারায় থাকা একটি গাড়ি মেইন গেটে পৌঁছালে ৪০-৫০ জন ছাত্র সেটি আটকে দেয়। গাড়ির ভেতর নারী শিক্ষকসহ অন্যান্য সহকর্মীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি তাদের প্রক্টর অফিসে নিয়ে যেতে চাইলে ট্যুরিজম বিভাগের ছাত্ররা জোরপূর্বক তালাবদ্ধ বিভাগীয় অফিসে নিয়ে যাওয়ার দাবিতে হইচই ও তর্কে লিপ্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের নিবৃত করতে গেলে এক পর্যায়ে পেছন থেকে একজন আমাকে ধাক্কা মারে। ধাক্কা খেয়ে আমি পড়ে যাচ্ছিলাম, কোন মতে নিজেকে কন্ট্রোল করছি। আমি তো প্রথমত শিক্ষক। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সন্তানের মতো ছাত্রদের কাছ থেকে এ আচরণ কাম্য নয়।”
 
প্রসঙ্গত, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে যোগদানের জন্য বেলা ৯ টার দিকে বিভাগের শরিফুল ইসলাম জুয়েল ঝিনাইদহের বাসা থেকে বের হলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ মোটরসাইকেলযোগে তাকে বাসার সামনে থেকে তুলে নিয়ে যান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথমে অপহরণের বিষয়টি অস্বীকার করলেও ঘটনা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে আনুমানিক বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষক জুয়েলকে বাসায় পৌছে দেন।

LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর