চীনের গোপন পারমাণবিক পরীক্ষার নতুন তথ্য প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র

নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ২০২০ সালের জুন মাসে একটি গোপন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল চীন। এ সংক্রান্ত নতুন কিছু তথ্য তাদের হাতে এসেছে বলে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তিনি জানিয়েছেন। খবর রয়টার্সের

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী সচিব ক্রিস্টোফার ইয়াও ওয়াশিংটনে এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘কাজাখস্তানের একটি দূরবর্তী ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ২০২০ সালের ২২ জুন পশ্চিম চীনের লোপ নুর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে প্রায় ৭২০ কিলোমিটার দূরে ২ দশমিক ৭৫ মাত্রার একটি বিস্ফোরণ শনাক্ত করেছিল।’

ইয়াও বলেন, ‘এরপর থেকে আমি আরও অতিরিক্ত তথ্য পর্যালোচনা করেছি। আমি বলব, এটি বিস্ফোরণ ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এসব তথ্য খনিশিল্পে ব্যবহৃত বিস্ফোরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি কোনোভাবেই ভূমিকম্পের সঙ্গে মেলে না।

এটি ঠিক সেই ধরনের সংকেত, যা একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত বলেও জানান তিনি। তবে পারমাণবিক পরীক্ষার বিস্ফোরণ শনাক্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে, ইয়াওয়ের এই অভিযোগ নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য তাদের কাছে নেই।

ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, ‘চীনের পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরুর অজুহাত তৈরির চেষ্টা মাত্র।’

তিনি আরও বলেন, ‘পারমাণবিক পরীক্ষা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে পাঁচটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। পাশাপাশি পারমাণবিক পরীক্ষাবিরোধী বৈশ্বিক ঐকমত্য বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও বিস্তাররোধ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করতে বাস্তব পদক্ষেপ নিতেও ওয়াশিংটনের প্রতি বেইজিংয়ের পরামর্শ থাকবে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সীমাবদ্ধতা চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বিশ্ব একটি দ্রুতগতির পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে এগোচ্ছে—এমন আশঙ্কাও জোরালো হয়েছে। এমতাবস্থায় ট্রাম্প চীনকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে একটি নতুন কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসতে চাপ দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড।

চীন ১৯৯৬ সালের পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তারা তা অনুমোদন করেনি। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো চলতি মাসের শুরুতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর বিষয়ে অভিযোগ তুললে তা অস্বীকার করে বেইজিং। চীনের সর্বশেষ সরকারি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে।

কাজাখস্তানের পিএস তেইশ ভূকম্পন কেন্দ্রটি একটি বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অংশ, যা ওই আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিচালনা করে। সংস্থাটির নির্বাহী সচিব রবার্ট ফ্লয়েড এক বিবৃতিতে জানান, ২০২০ সালের ২২ জুন কেন্দ্রটি ১২ সেকেন্ড ব্যবধানে দুটি খুবই ছোট ভূকম্পনজনিত ঘটনা রেকর্ড করেছিল।

তিনি বলেন, ‘এই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সাধারণত ৫০০ মেট্রিক টন টিএনটির সমপরিমাণ বা তার বেশি শক্তির পারমাণবিক বিস্ফোরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘটনা শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু ওই দুটি ঘটনা এই সীমার অনেক নিচে ছিল। ফলে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে এসব ঘটনার কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।’

ইয়াও দাবি করেন, চীন ‘ডিকাপলিং’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে পরীক্ষাটি আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। এ পদ্ধতিতে বিস্ফোরক যন্ত্রটি একটি বড় ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে বিস্ফোরিত করা হয়, যাতে পার্শ্ববর্তী শিলার মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কম্পনের মাত্রা কমে যায়।

চীনের মতো যুক্তরাষ্ট্রও পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকারী চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এখনো তা অনুমোদন করেনি। তবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় উভয় দেশই চুক্তির বিধান মানতে বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯২ সালে সর্বশেষ ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়।

এরপর থেকে তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সুপারকম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন ব্যবহার করে বহু বিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের পারমাণবিক ওয়ারহেড কার্যকর আছে কি না তা নিশ্চিত করছে।

চীন তিন পক্ষের একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, তাদের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ওয়াশিংটন ও মস্কোর তুলনায় অনেক ছোট—এই দুই দেশই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বলছে, চীনের বর্তমানে ৬০০টির বেশি সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে এবং দেশটি তাদের কৌশলগত পারমাণবিক শক্তির বড় ধরনের সম্প্রসারণ চালাচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর