জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়ে নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎকার, উঠে এল অনেক অজানা তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৫ আগষ্ট ২০২৬ ১১:০৮ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেরিয়েছে দুই বছর। ক্ষমতায় এসেছে নির্বাচিত সরকার। আর সংস্কার, বিচার, জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালো করেছে বিরোধী দল। যদিও যুক্তি তর্কে জনমনে প্রশ্ন ওঠে, কোন সীমাবদ্ধতায় অধরা কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের স্বপ্ন? এসব বিষয়ে চ্যানেল 24 এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

শুরুতে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, প্রাপ্তির তালিকায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও সংস্কার ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধূসর হয়ে যাচ্ছে। অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সংস্কার, বিচার ও গণভোট বাস্তবায়ন ঘিরে। ১৬ বছর বাংলাদেশ যেভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, সেখানে থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। তবে প্রজন্ম ও বাংলাদেশের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান সবচেয়ে বড় ঘটনা হয়ে থাকবে। 

কারণ হিসেবে অন্তবর্তী সরকারের অবস্থানের কথাই জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের চরিত্র পরিষ্কার ছিল না। এটা কি কেয়ারটেকার সরকার, যে জাতীয় ঐক্যমতের মাধ্যমে নির্বাচন করবে? নাকি তারা একটা বিল্পবের চেতনা ধারণ করে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে যাবে?

বিপ্লবের এই নেতা বলেন, অভ্যুত্থানের নেতারা চেয়েছিল বিপ্লবী সরকার। যারা বিপ্লবের চেতনা ধারণ করবে। তার মতে, সংবিধান বাতিল না করা এবং স্থগিত না করায় অন্তবর্তী সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এছাড়া অন্তবর্তী সরকারও তার চরিত্র ঠিক করতে পারেনি। অভিযোগ করেন, সংস্কারের কথা বলেও নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করেছে অন্তবর্তী সরকার।

তিনি বলেন, অন্তবর্তী সরকারেরই সংস্কার ও সংবিধান পরিবর্তন করে ফেলা উচিত ছিল। এছাড়া বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক ঐকমত্যের আলোচনা, তা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা ছিল পরিবর্তনের। এখন ঐক্যমত করে একটা জায়গায় আসার পর নির্বাচিত সরকার তা মানছে না।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের অভিযোগ, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকেই দায় এড়ানোর চেষ্টায় মগ্ন। অধরা বিচার ও সংস্কারের দায়িত্ব সবাইকেই নিতে হবে। 

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর কি করেছে সরকার? বাজেটে আর্থিক সহায়তার বিষয়টি অন্তবর্তী সরকার করে গেছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে পারেনি, বিচারও প্রশ্নবিদ্ধ। বিএনপি সব গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী হয়েও কোনও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করেনি। এর পরিণতিও তাদের ভালো হয়নি’।

History

তবুও জাতীয় স্বার্থে সরকাররে যৌক্তিক সমালোচনা অব্যহত রাখার কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে জোর দেবে এনসিপি। সংগঠিত করবে জনগণকে। এছাড়া দাবি আদায়ে ফের গণঅভ্যুত্থান কখনোই জাতীয় নাগরিক পার্টির আকাঙ্ক্ষা নয় বলে সাফ জানান নাহিদ ইসলাম। ফের গণঅভ্যুত্থান হোক, সরকার ওই রকম জায়গায় যাক সেটিও এনসিপি চায় না। প্রশ্ন রাখেন, গণঅভ্যুত্থান করেই কেন সব আদায় করতে হবে?

মার্কিন চুক্তি ও চীন সফরসহ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোর বিষয়ে সংসদে আলোচনা প্রসঙ্গেও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। মূলত এই চুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকাররে ধারাবাহিকতাই রাখছে বর্তমান সরকার। তিনি চুক্তির মধ্যে থাকা আপত্তির বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তার মতে, ঢালাও ভাবে চুক্তির বিরোধিতা করার পক্ষে না এনসিপি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ভারসাম্যপূর্ণ কুটনীতি ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই কথা বলতে হবে।

এদিকে চীন সফর ইতিবাচক হলেও দৃশ্যমান অর্জন আছে বলে মনে করেন না নাহিদ ইসলাম। কারণ বৈঠকে তিস্তা চুক্তি বা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এছাড়া এমইউগুলোর কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই বলেও দাবি তার।

কথা প্রসঙ্গে অভ্যুত্থানের ৭ মাসের মাথায় গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির ভবিষ্যত পরিকল্পনা, জোট নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ১০ বছরের মধ্যে এনসিপিকে রাজনৈতিক দল হিসেব প্রতিষ্ঠা করা, সংস্কার বাস্তবায়ন ও প্রজন্মেরদল হিসেবে সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা আছে। আর ১১ দলীয় জোটকে নির্বাচনি কৌশলগত জোট হিসেবে মূল্যায়ন করেন এনসিপি আহ্বায়ক। 

তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় জোট তৈরি হয়েছিল, সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা না থাকলে জোটও থাকবে না। এছাড়া স্বাধীনতা বিরোধিতার দায় এনসিপির নয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সংস্কারের পক্ষের এই বৃহত্তর ঐক্যে দল ভেদে আদর্শ ভিন্ন।তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি পুরোনো রাজনৈতিকদলগুলোকে চাপে ফেলেছে। তবে এনসিপি আরও ভালোভাবে, আরও আগে শক্তিশালীভাবে গঠিত হতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গলের হতো।

সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষে নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১১ নিয়ে সীমাবদ্ধতার বিস্তারিত তুলে ধরেন নাহিদ। তিনি বলেন, এলাকার সমস্যগুলো আমরা খুঁজে বের করেছি। যদিও বিরোধীদল হিসেবে এনসিপির সুযোগ কম। বরাদ্দও সীমিত। তিনি অভিযোগ করেন, সরকাররে সমালোচনা করলে সেই বরাদ্দে আরও চাপ বাড়ে।

এছাড়া সিটি করপোরেশনের দলীয় প্রশাসক স্থানীয় পরাজিত প্রার্থীকে নিয়ে এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করছে বলেও দাবি করেন তিনি। এমনকি বিরোধীদলীয় আসনগুলোর দায়িত্ব সংরক্ষিত মহিলা এমপিদের দেয়া হচ্ছে বলেও গুঞ্জন আছে বলে জানান তিনি। যদিও এই প্রতিকুলতার মাঝেই এলাকার উন্নয়ন কাজ চলছে।

সবশেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবটা পাশে রেখেই, সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার বার্তা দেন বিরোধীদলীয় এই চিফ হুইপ। একইসঙ্গে সরকারকে তা বাস্তবায়ন করানোই এনসিপির আগামীর পরিকল্পনা বলে জানান তিনি।

LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর