ট্রাম্পের উষ্ণ অভ্যর্থনায় যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিং
বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও ইরানের মতো জটিল বিষয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করার মধ্যেই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। স্থানীয় সময় বুধবার (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
প্রায় তিন বছরের মধ্যে শি জিনপিংয়ের এটিই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। এই সফর থেকে বড় কোনো ঐতিহাসিক চুক্তির আশা না করা হলেও, ওয়াশিংটন ও বেইজিং তাদের ১১ মাসের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টে জানান, তারা বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছেন। মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে শি জিনপিং বিমান থেকে নামলে ট্রাম্প নিজে উপস্থিত থেকে তাকে অভ্যর্থনা জানান, যা এই সফরের উচ্চ গুরুত্ব স্পষ্ট করে তোলে।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
বিমানবন্দরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দুই দেশের শীর্ষ নেতা ও তাদের স্ত্রীরা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলান, কিছুক্ষণ কথা বলেন ও ছবি তোলেন।
সি-স্প্যানের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট এই প্রথম ১১ বছরের মধ্যে কোনো বিদেশি নেতাকে সরাসরি অ্যান্ড্রুজ সামরিক ঘাঁটিতে গিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। এর আগে ২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে পোপ ফ্রান্সিসের জন্য এমন সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল।
চীনা দূতাবাসের প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে শি জিনপিং বলেন, “চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হওয়া উচিত।” তবে ওই বিবৃতিতে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের শুল্কযুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল ও শতভাগ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে একটি সীমিত বাণিজ্য চুক্তিও বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী ফক্স নিউজকে জানান, বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে উভয় পক্ষ ইতিমধ্যে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হবে। এটি ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে উভয় দেশের মধ্যে এখনো গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিরল মৃত্তিকা ধাতু ও কম্পিউটার চিপের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের মতো বিষয়গুলোতে বেইজিং-ওয়াশিংটন একে অপরের বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমান বৈঠকটি ট্রাম্পের জন্য এক কঠিন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, কারণ তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে জনগণের অসন্তোষের মুখে রয়েছেন। অন্যদিকে, শি জিনপিং তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে থেকে এই সফর শুরু করেছেন, চীনের বাণিজ্য খাত বেশ রমরমা অবস্থায় রয়েছে।
ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কিছু নেতারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে মনে করেন। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি ট্রাম্পের বন্ধুসুলভ আচরণ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, শি জিনপিং তাইওয়ানের ওপর বেইজিংয়ের দাবির বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপন করতে পারেন, যা ওয়াশিংটন এড়িয়ে চলতে চায়। অন্যদিকে ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের আপত্তি সত্ত্বেও কম্পিউটার চিপে কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে অচলাবস্থা নিরসনে বেইজিং ট্রাম্পকে কোনো সাহায্য করবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে বৃহস্পতিবার নির্ধারিত বৈঠকে নির্দিষ্ট কিছু খাতে শুল্ক কমানো, মাদক পাচার রোধে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামরিক পর্যায়ে বৈঠক বাড়ানোর বিষয়ে চুক্তি হতে পারে। সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প চীন বা অন্য কোথাও আটক কিছু মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিষয়েও জোর দিতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখেও তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা এই দুই দেশ এই বিষয়ে আরো আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও শি জিনপিং এখনই বড় কোনো ছাড় দেওয়ার পথে নাও হাঁটতে পারেন।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের কর্মকর্তা এডগার কাগান রয়টার্সকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন- সময়ের সাথে সাথে মার্কিন অর্থনীতি আরো বড় ও শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন- যুক্তরাষ্ট্র পতনের দিকে যাচ্ছে এবং সময় চীনের পক্ষেই রয়েছে।”
এআই প্রধানদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজসভা
এই সফরের অন্যান্য জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় ভোজসভা, হোয়াইট হাউজের সামরিক অনুষ্ঠান ও ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন, যেখানে মূল স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র ও সংবিধান সংরক্ষিত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় উভয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের একত্রিত হওয়ার কথা রয়েছে। এদের মধ্যে অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনআই-এর স্যাম অল্টম্যানের মতো শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত থাকতে পারেন।
গভীর মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্যে হলো নিজ নিজ দেশ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বার্তা দেওয়া। ট্রাম্প ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এটি তৃতীয় বৈঠক। আগের দুটি বৈঠকের মতো এবারের বৈঠক শেষেও কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন না করে, দুই দেশই আলাদাভাবে ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যাতে নিজ দেশের জনগণের কাছে নিজ নিজ বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছানো যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছর ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে আরো একটি বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আগামী নভেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিত হতে এপেক সম্মেলন কিংবা ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে হতে পারে।
LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: