ক্রিকেট বোর্ডে মন্ত্রীদের সন্তান, আবার জুলাই জাদুঘরের সভাপতিও কেন মন্ত্রী
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল। এই প্রক্রিয়াকে ‘দিনদুপুরে রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ ও ‘প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মহোৎসব’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেছেন, আমরা দেখেছি বাংলাদেশ ব্যাংক দখল করে ব্যাংককে দলীয়করণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দলীয়করণ করা হচ্ছে। এমনকি ক্রিকেট বোর্ডেও দলীয়করণ ও পরিবারকরণ— সবকিছু করা হয়ে গেছে। মন্ত্রীদের সন্তানরা পর্যন্ত সেই ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য হয়ে গেছেন। এখন আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘরেও মন্ত্রীকে কেন সভাপতি হতে হবে? সেটা তো মন্ত্রণালয়ের অধীনেই একটি প্রতিষ্ঠান।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাস হওয়ার পর অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন।
স্পিকারের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় সংসদে আপনার সভাপতিত্বেই একটি বিল সংশোধনীসহ পাস হয়ে গেল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল ২০২৬। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোকে নিয়ে একটা বিশেষ কমিটি করা হয়েছিল, যেই কমিটিতে ৯৮টি অধ্যাদেশ সম্পর্কে আমরা ঐক্যমত পোষণ করেছি, যে ৯৮টি অধ্যাদেশ এজ ইটিস এটা সংসদে আসবে বিল আকারে এবং পাশ হবে। বাকিগুলাতে কিছুটাতে নোট অব ডিসেন্ট সংশোধনী আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল ২০২৬, সেটা কিন্তু সেই ৯৮টি অধ্যাদেশের একটি; যেটা নিয়ে সবাই ঐকমত্য ছিল। এই বিলটা যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রচিত হয়েছে, গৃহীত হয়েছে, সেভাবে এটা পাস হবে। এখন আজকে যখন এটি পাস করার বা বিলটি উপস্থাপন উত্থাপনের সময় আসলো দেখেন আধা ঘণ্টা আগে একটা সংশোধনী দেওয়া হলো। এখানে সংশোধনী যে কেউ দিতে পারে। যে ৯৮টায় ঐক্যমত আমরাও করেছি সেই ৯৮টার প্রত্যেকটাতে আমরা আপত্তি এবং সংশোধনী দিতে পারতাম, কিন্তু এটা আমাদের মধ্যে একটা কনসেনসাস হয়েছিল যে এই বিলগুলো নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন তুলব না। এ কারণে সেই সব প্রত্যেকটা বিলে কিন্তু আমরা হ্যাঁ বলেছি আমরা ঐকমত্য দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু সরকার দল আজকে... আপনার সামনে এটা কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ করা হলো, কনসেনসাস ভঙ্গ করা হলো। তাহলে এই বিশেষ কমিটি যেটা করা হয়েছিল সেই কমিটির কোনো প্রয়োজন ছিল না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা জানি বিরোধী দলের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-র আসলে এখানে কোনো মূল্য নেই। কিন্তু আমরা এখানে কেন আছি? আমরা এখানে আছি যাতে আমাদের আপত্তি থাকলে জনস্বার্থের বিষয়ে কথা বলতে পারি। সে কথা বলার সুযোগও যদি না দেওয়া হয়... এই বিলটি যেভাবে দিনে-দুপুরে একটা ছলচাতুরি করে, একটা জোচ্চুরির মাধ্যমে সংশোধনী হিসেবে পাস করে নেওয়া হয়, আমরা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর কোনো শাখা জাদুঘর নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত জাদুঘর। এই জাদুঘর গঠনের সময় সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছে। এর স্মৃতিকথাতেও শুধু গণঅভ্যুত্থান নয়, গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের স্মৃতিগুলোও নেওয়া হয়েছে— সবকিছুই সেখানে আছে। কিন্তু এখন যদি মন্ত্রীকে সেখানে বসানো হয়, তবে প্রথমত এটি রেওয়াজ ভঙ্গ করা হয়।”
তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত এটি যে আমরা বর্তমান সরকারের যে প্রবণতা দেখছি— বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা— সেটিরই একটা ধারাবাহিকতা। আমরা দেখেছি বাংলাদেশ ব্যাংক দখল করে ব্যাংককে দলীয়করণ করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হচ্ছে। এমনকি ক্রিকেট বোর্ডেও, দলীয়করণ ও পরিবারকরণ—সবকিছু করা হয়ে গেছে। আমাদের মাননীয় মন্ত্রীদের সন্তানরা সেই ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য হয়ে গেছেন। এখন আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘরেও মন্ত্রীকে কেন সভাপতি হতে হবে? সেটা তো মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি প্রতিষ্ঠান।
তিনি আরও বলেন, আর দ্বিতীয় যে সংশোধনী— সরকার চাইলে যে কাউকে বাদ দিয়ে দিতে পারবে। এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করি, এটি সকল পক্ষের ফ্যাসিবাদবিরোধী অংশীদারিত্বের একটি ফসল। এই জাদুঘর পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সকলের সেই কনসেনসাস (ঐকমত্য) থাকা উচিত। এখন সরকার সম্পূর্ণভাবে এটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং এই বিল পাসের মাধ্যমে তা নিয়ে যাচ্ছে।
ফলে আমি আপনার কাছে অনুরোধ জানাব, সরকারের প্রতিও আহ্বান জানাব যে—সংশোধনী বাদ দিয়ে বিলটি আগে যেভাবে ছিল এবং বিশেষ কমিটিতে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সেই অনুযায়ী যাতে এই বিলটি আবার পাসের ব্যবস্থা করা হয় বা সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আর না হলে আমাদের এখানে থাকার কোনো দরকার নেই।
LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: