কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের ইঙ্গিত তারেক রহমানের

নিউজ ডেস্ক প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০০:০৭ এএম

কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের ইঙ্গিত তারেক রহমানের

সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর এবার দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দিচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠন, কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে দলকে সক্রিয় করতে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছেন তিনি।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং আগামী বছরে দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আয়োজনের লক্ষ্য সামনে রেখে পর্যায়ক্রমে মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তারেক রহমান। এর অংশ হিসেবে শনিবার (৪ জুলাই) রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি এবং অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গেও শিগগিরই বৈঠক করবেন তারেক রহমান। এরপর পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যের ভাষ্য, সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। ফলে, নেতাকর্মীরাও নিজ-নিজ ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই স্থবিরতা কাটিয়ে নেতাকর্মীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করাই এখন তারেক রহমানের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে দল ও সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত যতদূর সম্ভব মিটিয়ে কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাচ্ছেন তিনি।

দলের দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, ধারাবাহিক এই বৈঠক ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনে নতুন গতি আসবে এবং নানা কারণে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সাংগঠনিক কার্যক্রমও আবার শুরু হবে।

গুলশান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমান শুরুতে ঢাকা জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায়ের নেতৃত্বে নেতারা অংশ নেন। নিপুণ রায়  প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন। তবে, আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

জানা গেছে, এরপর স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ ৩ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসিন আলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান অংশ নেন। বৈঠকে তারেক রহমান নেতাদের কাছে সাংগঠনিক অবস্থা ও সারা দেশে কমিটির বিষয়ে জানতে চান। একই সঙ্গে সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি দেওয়ার ইঙ্গিত দেন।

তবে, এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘এখানে লুকোচুরি করার কিছু নেই, আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এছাড়া সংগঠনের সভাপতি এস এম জিলানী বর্তমানে সংসদ সদস্য, আর সাধারণ সম্পাদক প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে অনেক জেলায় কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন নতুন কমিটি হওয়াই স্বাভাবিক।’

এই নেতা আরও বলেন, তবে নতুন কমিটি কবে হবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখের কথা উল্লেখ করেননি প্রধানমন্ত্রী। ধারণা করছি, আগামী ৫ আগস্টের আগে নতুন কমিটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মেয়াদোত্তীর্ণ সংগঠনের জেলা কমিটিগুলোকে দ্রুত কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন কমিটি গঠন যেন কোনো বিতর্কের জন্ম না দেয়।

২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সর্বশেষ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় আধা ঘণ্টার এই বৈঠকে তিনি সংগঠনের বর্তমান অবস্থা, নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা, থানা-ওয়ার্ড কমিটির মেয়াদ এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠকে উপস্থিত নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন, এখন থেকে সংগঠনের জন্য নিয়মিত সময় দেবেন। দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে একটি কার্যকর অবস্থানে নিয়ে যেতে চান তিনি।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। যেসব থানা-ওয়ার্ড কমিটি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল, সেগুলোকে গতিশীল করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে কমিটি হলেও বৈঠকে আগামীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের সব পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, কাউন্সিলভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত হলে সংগঠন আরও গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য হবে।

এক নেতা বলেন, সামনে ঢাকা সিটি নির্বাচন আছে। যে কারণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের থানা ও ওয়ার্ডগুলোতে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল কমিটিগুলোকে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বলেছেন।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুল আলম মজনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতাকর্মীদের খোঁজ নিয়েছেন। একইসঙ্গে নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দলকে শক্তিশালী করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী আগস্ট মাস থেকে পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি সূত্র বলেছে, দলের জেলা-মহানগর ও অঙ্গ-সংগঠনের পুনর্গঠনের কাজ শেষ হলে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করা হবে। আগামী বছরের শুরুর দিকে দলের কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যা কিছু হবে কাউন্সিলের মাধ্যমে হবে।’

প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটি ১০ বছর ধরে চলছে। এই দীর্ঘ সময়ে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি একাধিকবার পুনর্গঠন করা হয়েছে। সর্বশেষ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান।

এমএসএস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর