১২ ফেব্রুয়ারির পর নতুন বাংলাদেশ পাব: নাহিদ ইসলাম
ভোটারদের সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ভোটাধিকার রক্ষার জন্য, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ভোটকেন্দ্রে থাকব। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের ভোটাধিকার কেউই হরণ করতে পারবে না ইনশাল্লাহ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পাব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচন- এটা ভুলে না যেতে সবার
রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত জাতির উদ্দেশে ভাষণে এসব কথা বলেন ঢাকা-১১ আসনের ১১ দলীয় জোটপ্রার্থী নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের হাজারো ভাইবোনের আত্মত্যাগ, শহীদ পরিবারের আকুতি, আহত যোদ্ধাদের বেদনা- এসব কিছু মাথায় রেখেই আমরা যেন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে সবাই মিলে অংশগ্রহণ করি। আপনারা আমাদের ভোট দেবেন, আমরা আপনাদের জন্য কাজ করব ইনশাল্লাহ। সবাই মিলে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজে এগিয়ে যাব।
তিনি বলেন, আমরা চাই পরিবর্তনের রাজনীতি, সংস্কারের রাজনীতি। বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত এবং আধিপত্যবাদমুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্যে আমরা ১১টি দল এবার ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। আমাদের এনসিপির ‘শাপলা কলি’ মার্কায় ৩০ প্রার্থী সারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। আপনারা তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ দিন, পরিবর্তনের রাজনীতিকে সুযোগ দিন।
পরিবর্তনের রাজনীতি, নাকি পুরোনো রাজনীতি, তা ১২ ফেব্রুয়ারি বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চায়, সংস্কার চায়। গত দেড় বছরে আমরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। সেই হতাশা আর ক্ষোভ আমাদের আছে। আমাদের অনভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিচ্ছি। আমরা আপনাদের কাছে আরেকবার সুযোগ চাচ্ছি, এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটকে সমর্থন করুন। ১১ দলীয় জোট আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করলে আমরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ, ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।
তিনি বলেন, শরীফ ওসমান হাদি এরকম একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাকে করুণভাবে শাহাদতবরণ করতে হয়েছে। আমরা নিশ্চয়ই সেই হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করব। জুলাইয়ের খুনিদের বিচার নিশ্চিত করব। অবশ্যই আগামী নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হচ্ছে। আপনারা অবশ্যই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেবেন। ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কারের ধারাকে অব্যাহত রাখবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি এ দেশের তরুণ সমাজকে আবারও দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, আমরা মনে করি যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যর্থ হয়, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ আগস্টের বিপ্লব ব্যর্থ হবে। ফলে ৫ আগস্টকে সফল করতে হলে, ৫ আগস্টের অর্জন আর আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা বঙ্গোপসাগরের সীমানা ঘিরে একটি সুনীল অর্থনীতি গড়ে তুলব এবং বঙ্গোপসাগরে আমাদের যে ন্যায্য হিস্সা রয়েছে, জনগণের অভিপ্রায় অনুসারে আমরা সেই হিস্সা আদায় করব। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আমাদের জাতীয় সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র আমরা তৈরি করব। আমরা আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়েও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে উপযোগী করে গড়ে তুলব। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য আমরা ব্যবস্থা নেব। আমরা পরিবেশ করের ব্যবস্থা করব, যাতে পরিবেশ দূষণ কমানো যায়।
তিনি বলেন, আমরা এক নতুন স্বপ্ন আর নতুন বাংলাদেশের অভিপ্রায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে নেমেছিলাম; আপনারাও নেমেছিলেন। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই আমরা আজ কথা বলতে পারছি। এতক্ষণ ধরে যা বললাম, সেটি আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন। যদি আপনারা সুযোগ দেন, আমরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ইনশাল্লাহ সক্ষম হব। আপনারা গত দেড় বছরে দেখেছেন কারা সংস্কারের বিরোধিতা করেছে, কারা নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছে, কারা পুরোনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, খুনি হাসিনাকে উৎখাত করার পর এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নামানো হয়েছে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলেও অপরাধীদের শনাক্ত করা, অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেপ্তারের মতো কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গুমবিষয়ক কমিশন এক হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা তথ্য ও আলামত নষ্ট করে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরা অসহযোগিতা করেই চলেছে। আমাদের লড়াই হবে সেই ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সব প্রবণতা সমাজ থেকে মুছে ফেলা।
তিনি বলেন, দেশবাসী যদি আমাদের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়, তবে স্বৈরাচার হাসিনার আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। লুটপাট ও অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার দোসর ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তাদের সুবিধাভোগী আমলা ও আত্মীয়-স্বজনদের আইন ও বিচারের আওতায় আনা হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদেশে পাচারকৃত এদের যে অর্থ ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছে, তা বাংলাদেশের কর বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে জরিমানাসহ ট্যাক্স বসিয়ে দেশে থাকা তাদের সমুদয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একইসঙ্গে চিহ্নিত লুটপাটকারীদের গণশত্রু ঘোষণা করে এদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর মালিকানায় নিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাজীবীদের নিয়োগ দিয়ে দক্ষ ও স্বচ্ছ ম্যানেজমেন্ট কাঠামোর মাধ্যমে নবগঠিত এই সংস্থাটি পরিচালনা করা হবে। আমাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট- ঘুস, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়- এই স্লোগান আওড়ালেও বাস্তবে খুনি হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারতের নির্দেশ পালন করা। সে কারণে পাকিস্তানের প্রতি সর্বক্ষেত্রে বৈরী আচরণ করা হতো। বাস্তবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ভারতের পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল তারা। তখন ঢাকার এই ফ্যাসিস্ট শাসকরা মনে করত দিল্লি তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের কেন্দ্র। সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল; তাতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি এবং কারো ওপর অতিনির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা হবে। আমরা অগণতান্ত্রিক শাসকদের নতজানু নীতি-কাঠামো ভেঙে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করব। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাব। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।
তিনি বলেন, আমরা যদি সরকার গঠন করতে পারি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করব। আমাদের লক্ষ্য হবে বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং গুণগত মান বৃদ্ধি করা। পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাই-টেক বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে। একই সঙ্গে দেশের সব ১৮-ঊর্ধ্ব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক মিলিটারি ট্রেনিং চালু করা হবে, এতে দেশব্যাপী জনভিত্তি সম্পন্ন এক গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ফলে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমবে।
সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবেন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। এমন দুষ্টুচক্রের বিরুদ্ধে আইন করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কারসাজি ও অবৈধ মজুতদারি প্রমাণিত হলে অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অযৌক্তিকভাবে সারাদেশে সাধারণ মানুষকে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। সরকার ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা এবং ওএমএস কর্মসূচি বিস্তৃত করবে। যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সহজে সুলভে পণ্য কিনতে পারে। প্রতিবেশী বৃহৎ দেশটির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো হবে যাতে কেউ আমাদের পণ্যবন্দি করে বিপদে ফেলতে না পারে। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট— একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ পুলিশকেও ‘পুলিশ লীগ’ নামে ডাকতে শুরু করেছিল উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা তখনকার পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও পুলিশ ব্যাপক নৃশংসতা করেছে। আমরা সরকার গঠন করলে, জুলাই বিপ্লবের সময় এবং এর পূর্বাপর ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি করে অর্থ লোপাট ও ঘুস-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল— তাদের প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, এমন সব বিচার সম্পন্ন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশকে খোলনলচে বদলে পুনর্গঠন করা হবে। দেশ ও জনগণের সেবা হবে পুলিশের একমাত্র মন্ত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় সংকীর্ণ মনোভাবের সংস্কৃতিকে কবর দিয়ে বাহিনীকে জননিরাপত্তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন জানিয়ে নাহিদ বলেন, প্রথমত, দেশবাসীর মতামত নিয়ে, ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন ও নানা জুলুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহনী’ বা অন্যকিছু রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে একে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে। উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানেই পদায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সমানসংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে।
ভয়ঙ্কর অশুভ চর্চার কারণে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরা তাদের সব গৌরব, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত সব স্তরে ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগ করে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিচারকের সংখ্যা বহুগুণে বাড়াতে হবে, পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে, ঘুষ দুর্নীতি নির্ভর রায় বেচা-কেনার চলমান আয়োজন ভেঙে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে এদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই এনসিপির অঙ্গীকার।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। প্রতিটি স্তরে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। যে কোনো পর্যায়ের স্থানীয় সরকারে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক পাস যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হবে। শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে। অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতা নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবার সহাবস্থান থাকবে। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে। প্রত্যেক নাগরিক নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
নাহিদ বলেন, গৃহস্থলে সহিংসতা, যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। অতীতের অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে, সরকার অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা কঠোর আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। তেমনি নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রচলিত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ করা গেলে এমন অপরাধ কমে যাবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোনো নারী নির্যাতনের ঘটনায় আশপাশে উপস্থিত মানুষ বা প্রতিবেশীদের প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি নীরব দর্শকের ভূমিকায় না থাকে, তাহলে এমন অপরাধ সমাজে কমে যাবে।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে না; সবাইকে সাধারণ জনপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। মন্ত্রীদের কমপক্ষে সপ্তাহে এক দিন এবং সচিবদের কমপক্ষে সপ্তাহে দুদিন জনপরিবহনে চলাচল করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীলদের জনজীবনের বাস্তবতা অনুভব করতে হবে— এটাই হবে সরকারের নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি।
নাহিদ বলেন, আধুনিক বাস সার্ভিস চালুসহ অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিটি রুটে মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের সময় ও খরচের সাশ্রয় হয়। ছাত্রছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পরিবহনে বিশেষ ছাড় এবং সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হবে। যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত যানবাহন রাস্তা থেকে অপসারণ করা এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হবে। পরিবহন খাতে অবৈধ চাঁদাবাজি ও কালোবাজারি কঠোর হাতে দমন করে ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করা হবে। টিকিটিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য ট্রেন ভ্রমণ সহজলভ্য হয়। বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রে নিলামভিত্তিক অস্বচ্ছ ব্যবস্থা বন্ধ করা হবে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: